“টলিপাড়া রাজনীতিমুক্ত হবেই…” বাংলায় বিজেপি সরকার আশায় আত্মবিশ্বাসী অঞ্জনা বসু! তৃণমূল জমানায় টলিউডে ‘ব্যান কালচার’, ভ’য় দেখিয়ে কাজ বন্ধ, অভিনেত্রীর বিজেপি করার কারণে কটা’ক্ষ, ইন্ডাস্ট্রির অন্দরমহলের সেই ‘অত্যা’চারের’ কথা ফাঁস করলেন তিনি!

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকার গঠনের প্রস্তুতি শুরু হতেই রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি বাংলা ইন্ডাস্ট্রির অন্দরমহলের নানা কথাও সামনে আসতে শুরু করেছে। দীর্ঘদিন ধরে টলিউডে শাসকদলের প্রভাব, পক্ষপাতিত্ব এবং ‘ব্যান কালচার’ নিয়ে যেসব অভিযোগ উঠছিল, সেই বিষয়েই এবার খোলাখুলি মুখ খুললেন অভিনেত্রী অঞ্জনা বসু (Anjana Basu)। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, যখন বাংলায় বিজেপির “নামগন্ধও ছিল না”, তখন থেকেই তিনি এই দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং বহু বাধা, কটাক্ষ ও বিরোধিতার মুখোমুখি হয়েছেন। তাঁর কথায়, “২০১২ সাল থেকে আমি ভারতীয় জনতা পার্টির সঙ্গে। তখন সবাই তৃণমূলে যাচ্ছিল, আর আমি বুক ঠুকে বলেছি আমি বিজেপির কর্মী।”

অঞ্জনা বসু বলেন, সেই সময় তাঁকে অনেকেই “বোকা” বলেছিলেন। অনেকে তাঁকে বুঝিয়েছিলেন যে ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করতে গেলে শাসকদলের বিরুদ্ধে গিয়ে টিকে থাকা সম্ভব নয়। কিন্তু তিনি নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি। অভিনেত্রীর দাবি, তিনি সবসময় অন্যায়, দুর্নীতি এবং পক্ষপাতিত্বের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। তাঁর কথায়, “সবাই বলত এখানে থাকিস, কাজ করিস, ছেলে ছোট, এত বিদ্রোহী হবার কী আছে? কিন্তু আমি প্রতিবাদী ছিলাম, এখনও আছি।” নতুন রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তিনি আবেগঘন ভাবে বলেন, “আজকে যেদিকে তাকাবে সেদিকে পদ্মফুল। এই খুশি প্রকাশ করার ভাষা নেই।”

সাক্ষাৎকারে টলিউডের ‘ব্যান কালচার’ নিয়েও বিস্ফোরক মন্তব্য করেন অভিনেত্রী। তিনি সরাসরি প্রশ্ন তোলেন, “কে বা কার রাইট আছে একজন শিল্পীকে বলার যে তুমি কাল থেকে কাজ করবে না?” তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ইন্ডাস্ট্রিতে এক ধরনের ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল, যেখানে প্রযোজকেরাও চাপের মুখে পড়তেন। অঞ্জনার দাবি, “তাদের চোখ রাঙানির ভয় প্রডিউসাররা নিতে পারছিলেন না। কিন্তু এখন সেই ভয় আর থাকবে না।” তবে একইসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলেও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার রাজনীতি হওয়া উচিত নয়। তাঁর বক্তব্য, “যারা সকাল পর্যন্ত জয় বাংলা বলেছে, তারা হঠাৎ জয় শ্রীরাম বলছে। কিন্তু আমাদের দল বলেছে, এটা আমাদের সংস্কৃতি নয়।”

অভিনেত্রী আরও বলেন, তাঁর রাজনীতিতে আসার মূল কারণই ছিল ইন্ডাস্ট্রির রাজনীতিকরণ বন্ধ করা। তাঁর মতে, স্টুডিওর ভেতরে রাজনৈতিক বিভাজন কখনওই থাকা উচিত নয়। অঞ্জনার কথায়, “রাজনীতির ময়দান আলাদা, স্টুডিওর দরজা বন্ধ করে রাজনীতি আমি বিশ্বাস করি না।” তিনি জানান, শুধুমাত্র অভিযোগ করে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকলে পরিবর্তন আনা যায় না বলেই তিনি সিস্টেমের ভেতরে ঢোকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তাঁর দাবি, তিনি কোনও পদ বা টিকিটের আশায় রাজনীতিতে আসেননি। বরং একজন সাধারণ কর্মী হিসেবেই কাজ করতে চেয়েছেন। “আমাকে যদি দল কোনও দায়িত্ব দেয়, আমি সেটা মাথায় করে পালন করব,” জানান অভিনেত্রী।

নতুন সরকার নিয়ে নিজের প্রত্যাশার কথাও খোলাখুলি জানান অঞ্জনা বসু। তাঁর মতে, বাংলাকে আবার আগের শান্ত, নিরাপদ ও সংস্কৃতিমনস্ক জায়গায় ফিরিয়ে আনা দরকার। তিনি বলেন, “আমরা যে বাংলা দেখেছি, সেই বাংলাকে ফিরিয়ে দিতে চাই।” অভিনেত্রী জানান, আগে গভীর রাতে শুটিং শেষে বাড়ি ফিরতে তাঁর ভয় লাগত। কিন্তু নির্বাচনের ফল বেরোনোর পর প্রথমবার তিনি নাকি নিরাপত্তার অনুভূতি পেয়েছেন। তাঁর কথায়, “কাল রাত দুটোয় বাড়ি ফিরছিলাম, কিন্তু কোথাও ভয় লাগেনি। মনে হচ্ছিল আমরা সেফ হ্যান্ডে আছি।” একইসঙ্গে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আজকের বাংলায় বহু পরিবার ভেঙে যাচ্ছে, কারণ কাজের জন্য নতুন প্রজন্মকে রাজ্যের বাইরে চলে যেতে হচ্ছে।

আরও পড়ুনঃ “শিল্পীদের দাঁড় করালেই ভোট আসে না, প্রমাণিত হলো!” “১৫ বছর আগে রাজ্য এমন ছিল না, মমতাকে শ্রদ্ধা করি, কিন্তু…” হারের পর দলকেই খোঁচা রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের?

সাক্ষাৎকারের শেষদিকে অঞ্জনা বসু স্পষ্ট করে জানান, সাধারণ মানুষের ক্ষোভই এই নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করেছে। দুর্নীতি, চাকরি কেলেঙ্কারি, শিক্ষকদের আন্দোলন থেকে শুরু করে মহিলাদের নিরাপত্তা, সব ইস্যুতেই মানুষ ক্ষুব্ধ ছিল বলে দাবি করেন তিনি। অভিনেত্রীর কথায়, “২৬ হাজার মানুষের চাকরি গেছে, শিক্ষিত মানুষ বছরের পর বছর রাস্তায় বসে থেকেছে। জনতা তার হিসেব দিয়েছে।” পাশাপাশি তিনি বলেন, পরিবর্তনের পর এখন মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেড়েছে। শুধু টলিউড নয়, গোটা পশ্চিমবঙ্গের মানুষ চাইছে একটি শান্ত, নিরাপদ এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ। আর সেই প্রত্যাশা নতুন সরকার কতটা পূরণ করতে পারে, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে বাংলা।

You cannot copy content of this page